
নিজস্ব সংবাদদাতা: দীর্ঘ প্রায় ১৭ মাস ধরে টানাপোড়েন চলার পর অবশেষে গণইস্তফা দিলেন দুরামারি পল্লী মঙ্গল সমবায় সমিতির নবনির্বাচিত পরিচালন সমিতির ৬ সদস্য। তাঁদের অভিযোগ, নির্বাচনে জিতে বোর্ড গঠন করার পর চার্জ নিতে গিয়েই তাঁরা দেখতে পান সমিতির হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। খাতায়-কলমে লক্ষ লক্ষ টাকার জমা দেখানো হলেও ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে একটি টাকাও নেই। এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা কোনোভাবেই চার্জ নেননি। পরে বিষয়টি বারবার প্রশাসনের নজরে আনলেও কোনো সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁরা একযোগে পদত্যাগ করেন। জানা গেছে, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে দুরামারি পল্লী মঙ্গল সমবায় সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থিত বোর্ডের ৬ সদস্য জয়ী হন। নির্বাচনের পর নিয়ম অনুযায়ী বোর্ড গঠন করা হয় এবং সভাপতি, সম্পাদকসহ অন্যান্য পদে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। এরপর তাঁরা সমিতির চার্জ নিতে যান। কিন্তু চার্জ নিতে গিয়েই সামনে আসে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ। পরিচালন সমিতির সভানেত্রী দীপিকা রায় জানান, সমিতির নথিপত্রে ফিক্সড ডিপোজিট, ডেইলি ডিপোজিট (ডিডিএস) এবং সেভিংস অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে প্রায় ৬১ লক্ষ টাকার জমা দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। অর্থাৎ কাগজে-কলমে টাকা থাকলেও সেই টাকার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।দীপিকা রায় বলেন, আমরা সাধারণ মানুষের ভোটে জিতে এসেছিলাম। সবাই ভেবেছিল, আমরা দায়িত্ব নিয়ে মানুষের জমা রাখা টাকা ফেরত দিতে পারব। কিন্তু চার্জ নিতে গিয়েই দেখি ব্যাংকের অবস্থা একেবারে অন্যরকম। খাতায় টাকা আছে, কিন্তু ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে একটি টাকাও নেই। এই অবস্থায় আমরা চার্জ নিলে পরে সাধারণ মানুষ আমাদের কাছেই টাকা চাইত। অথচ দেওয়ার মতো কোনো টাকা আমাদের হাতে থাকত না। তাই আমরা তখনই সিদ্ধান্ত নিই, এই অবস্থায় চার্জ নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান, সমিতির ম্যানেজার তাঁদের বিভিন্ন হিসাব ও অডিটের কাগজ দেখান। সেখানে সব টাকার হিসাব দেখানো হলেও বাস্তবে সেই টাকা কোথায় রয়েছে, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে নতুন বোর্ডের সদস্যরা ওই হিসাব মেনে নিতে পারেননি। এদিকে প্রতিদিনই বহু আমানতকারী সমিতিতে এসে তাঁদের ফিক্সড ডিপোজিট, ডেইলি ডিপোজিট ও সেভিংস অ্যাকাউন্টের টাকা ফেরত চাইছিলেন। অনেকের জমার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন বোর্ড চার্জই নেয়নি। ফলে তাঁদের পক্ষে কোনো টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল না। পরিচালন সমিতির সদস্যদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা একাধিকবার জলপাইগুড়ির ডিআরসিএস, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ জানান। তাঁরা আশা করেছিলেন প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করবে এবং সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ১৭ মাস কেটে গেলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ। এই দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে পরিচালন সমিতির ছয়জন সদস্য একযোগে ডিআরসিএসের কাছে গণইস্তফা জমা দেন। তাঁদের বক্তব্য, চার্জ না নিয়েও প্রতিদিন সাধারণ মানুষের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছিল। মানুষ তাঁদের ফোন করছিলেন, বাড়িতে গিয়েও টাকা চাইছিলেন। অথচ তাঁরা কোনোভাবেই সেই টাকা ফেরত দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না। তাই আর এই দায়িত্বে থাকার কোনো অর্থ নেই বলেই তাঁরা মনে করেন।
পরিচালন সমিতির সদস্য আজিনুর ইসলাম বলেন, আমরা যখন কাগজপত্র দেখি, তখনই বুঝতে পারি বড় ধরনের গরমিল রয়েছে। কাগজে অনেক টাকা লেখা আছে, কিন্তু ব্যাংকে কোনো টাকা নেই। এমনকি সংশ্লিষ্ট সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংকেও সেই টাকার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। আমরা যদি চার্জ নিতাম, তাহলে পরে সমস্ত দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে আসত। তাই আমরা প্রথম থেকেই চার্জ নিইনি। তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষ আমাদের বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছিলেন। এখন তাঁরাই প্রতিদিন এসে টাকা চাইছেন। কিন্তু টাকা না থাকলে আমরা কোথা থেকে দেব? তাই বাধ্য হয়েই আমরা গণইস্তফা দিয়েছি। সমিতির সম্পাদক পরিমল রায় বলেন, আমরা ছয়জন সদস্যই একসঙ্গে পদত্যাগ করেছি। আমরা সবাই তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থিত বোর্ডের সদস্য। মানুষের স্বার্থে কাজ করার জন্যই নির্বাচনে লড়েছিলাম। কিন্তু চার্জ নিতে গিয়েই যখন এত বড় অনিয়ম চোখে পড়ল, তখন আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করিনি। এরপর দীর্ঘদিন প্রশাসনের হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু কোনো সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তবে পরিচালন সমিতির সদস্যরা সরাসরি কারও বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেননি। তাঁদের বক্তব্য, খাতায়-কলমে টাকা দেখানো হলেও বাস্তবে সেই টাকা কোথায় গেল, তা প্রশাসনের তদন্তেই পরিষ্কার হবে। তাঁরা চান, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক এবং যারা দোষী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এদিকে এই ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বহু সাধারণ মানুষ তাঁদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের টাকা ফেরতের অপেক্ষায় রয়েছেন। কারও ফিক্সড ডিপোজিটের মেয়াদ শেষ হয়েছে, কারও ডেইলি ডিপোজিট জমা রয়েছে, আবার কারও সেভিংস অ্যাকাউন্টের টাকাও আটকে রয়েছে। ফলে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে।
এখন এলাকাবাসীর একটাই দাবি দুরামারি পল্লী মঙ্গল সমবায় সমিতির সমস্ত হিসাব খতিয়ে দেখে দ্রুত তদন্ত সম্পূর্ণ করা হোক। খাতায় দেখানো প্রায় ৬১ লক্ষ টাকা কোথায় গেল, কারা এই অনিয়মের জন্য দায়ী এবং সাধারণ মানুষের জমা রাখা টাকা কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে, তার দ্রুত জবাব ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন তাঁরা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, সেদিকেও প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

