বসন্তের রক্তিম আভায় যখন প্রকৃতি সেজে উঠেছে মান্ডাল ও শিমুল ফুলের রঙে, ঠিক সেই শুভক্ষণেই উত্তরবঙ্গের বুকে এক অনন্য ইতিহাস রচনা করল ধূপগুড়ির কালীরহাট। ধূপগুড়ি-র কালীরহাটের দেবীডাঙ্গা এলাকায় সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হল ঐতিহ্যবাহী ত্যারেয়া উৎসব ও রাখাল সেবা।
বৃহস্পতিবার সকালে বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। এরপর গ্রামের মেয়ে-মহিলারা একত্রিত হয়ে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করেন, যা সমগ্র গ্রাম পরিক্রমা করে। শোভাযাত্রা পৌঁছায় গিলান্ডি নদীর তীরে, যেখানে জলবরণ করা হয় এবং গোরুকে স্নান করিয়ে মহাভারত-এ বর্ণিত প্রাচীন প্রথার স্মরণে আচার পালন করা হয়।

পরবর্তীতে তিন রাস্তার মোড়ে গ্রামের মা-মহিলারা একত্রিত হয়ে ত্যারেয়া ফেলেন।শীতকে বিদায় জানিয়ে বসন্তকে বরণ করার এক প্রাচীন লোকাচার। এরপর দেবীডাঙ্গা স্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় রাখালসেবা। পাশাপাশি ভাগবত পাঠ ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা উজ্জ্বল রায় জানান, “এর আগে কোথাও এত বড় আকারে আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যারেয়া ফেলা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়নি। বর্তমানে বসন্ত উৎসবের নানা আয়োজন দেখা গেলেও উত্তরবঙ্গের মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই ত্যারেয়া ফেলে বসন্তকে স্বাগত জানিয়ে আসছেন। সেই হারিয়ে যেতে বসা প্রথাকেই উৎসবের রূপ দেওয়ার আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াস।”
পরিচালন কমিটির সদস্য সুজয় রায় ও উৎপল রায় বলেন, “যদিও ত্যারেয়া অনেকেই ঘরে ঘরে পালন করেন, তবে এই প্রথমবার তা সামাজিক ও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যাপিত হল। আমরা আশাবাদী, আগামী দিনে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে এভাবেই ত্যারেয়া উৎসব পালিত হবে।” এ বিষয়ে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ধুপগুড়ির প্রাক্তন বিধায়িকা অতিথি মিতালী রায় বলেন – যারা এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তাদেরকে ধন্যবাদ। পাশাপাশি এই অনুষ্ঠান আরো দিক দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ুক আমরা চাই এবং পাশে আছি।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর ১৩ ফাল্গুন গ্রাম্য কচিকাঁচারা কলার ঢনায় পলাশ, মান্ডাল ও শিমুল ফুল সাজিয়ে তিন রাস্তার মোড়ে সমবেত হয়। শীতকে বিদায় জানিয়ে বসন্তকে আহ্বান করাই এই আচার-অনুষ্ঠানের মূল তাৎপর্য। লোকসংস্কৃতির এই অনন্য ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতেই কালীরহাটের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

